Friday, April 23, 2021

আস্থা

 আস্থা()

---------জসীম উদ্দীন

আমাদের আগের বিড়ালটি মারা যাবার পর আমার মেয়ে আর একটি বিড়াল ছানার জন্য বায়না ধরে, আমি অনেক খোঁজা খোঁজির করেও  একটি বিড়াল ছানা জোগার করতে পারিনি। মেয়ে তার ফেইসবুক গ্রুপে খবর পায় একটি মেয়ে একটি বিড়াল ছানা দত্তক দিবে। সাথে সাথে সে তার সাথে যোগাযোগ করে। জানতে পারে তাদের পোষা বিড়ালটি নাকি বেশ কয়েকটি বাচ্ছা দিয়েছে। তাই সেই বাচ্ছাদের থেকে একটি দত্তক দিতে চাইছে। এখন বিড়াল ছানাটি দত্তক  আনতে হবে।  আমি মেয়ের অনুরোধে তার সাথে  ছানাটি আনতে যেতে রাজী হলাম। আগে যোগায়োগ করে মেয়েকে নিয়ে তাদের বাসায় গেলাম।  মেয়ের বান্ধবী তখন বাসায় ছিলনা, মাকে বলে গেছে আমাদের আসার কথা। গিয়ে দেখলাম মেয়েটির মা বাসার ড্রয়িং রূমে কাঁথার  জড়িয়ে মানুষের বাচ্চার মত বিড়াল ছানাটিকে বুকে নিয়ে উৎকন্ঠিত চিত্তে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমরা বিড়াল ছানাটির প্রতি তার অত্যাধিক আদর দেখে অভিভূত হলাম। তিনি যখন বিড়াল ছানাটি আমাদের কাছে তুলে দিচ্ছিেলন তখন উৎকন্ঠিত কন্ঠে বলতে লাগলেন 'আপনারা এ ছানাটি দেখে রাখবেন, অবহেলা করবেনা না, আদর করবেন, য়দি পোষতে না পারেন তাহলে কোথাও ফেলে দিবেননা, আমাকে দিয়ে যাবেন। আমি ওদের নিজের সন্তানের মত আদর করি ভালবাসি।'' এ কথাগুলা বলতে বলতে মহিলাটি কান্না জুড়ে দিল। আমি চিন্তা করলাম পৃথিবী থেকে মায়া মমতা এখনো হারিয়ে যায়নি। এখনো কিছু দয়ালো মানুষ আছে বলে পৃথিবীটা এখনো সুন্দর মায়াবী লাগে।

যাই হউক, কান্না কাটির মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের হাতে বিড়াল ছানাটি তুলে দিলেন। আমরা একটা সিএনজি করে ছানাটি বাসায় নিয়ে এলাম। একটি বাক্সের মধ্যে তার থাকার ব্যবস্থা করলাম। কিন্তু সে সেখানে থাকবেনা, সে আমাদের সাথে থাকতে বেশী পছন্দ করে। তাকে আমরা দুধ খেতে দিলে সে তেমন খেতে চাইনা, দুধ থেকে তার বেশী পছন্দ মাছ। মাছের সাথে ভাত মেখে দিলে বেশ আনন্দে খায়। মনে হয় খুব ছোট থেকে তাকে মাছ ভাতে অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে। তার রুচি অনুযায়ী তাকে খাবার দিয়ে, মাঝে মাঝে ঠান্ডা লাগলে, পেটে অসুখ হলে নার্সের মত সেবা দিয়ে তাকে আমার মেয়ে সারিয়ে তোলে। এভাবে আমার ছেলে  মেয়ে এবং স্ত্রী অনেক আদর যত্ন করে বিড়াল চানাটি পোষতে লাগল, শুধু তাই নয়, তার একটি সুন্দর নামও রাখল। সবাই তাকে ডোরা নামে ডাকি। এভাবে ধীরে ধীরে বিড়াল ছানাটি বড় হতে লাগল। ঐ মহিলাটি যে রকম আদর করে তার বাসায় ছানাটিকে পোষছিল তার থেকে আমাদের বাসায়ও এই ছানাটির আদর য়ত্নের কোন কমতি ছিলনা। মাঝে মাঝে আমার মেয়ে বউয়ের মত করে সাজিয়ে বিড়ালটির সর্বশেষ আপডেট ছবি ওই  মেয়েটির মেসেঞ্জোরে পাঠায়। এখন তারাও আশ্বস্থ  যে তাদের দেয়া বিড়াল ছানটি বেশ ভালই আছে। তাই তারাও আর আগের মত তেমন খোঁজ খবর নেয় না। 

     আমাদের ডোরা এখন বেশ বড় এবং নাদুষ নোদুষ হয়েছে, তার ধবধবে সাদা রঙ, শুধু বাম কানের গোড়ায় একটু করে কালো ছোপ। তুলতুলে শরীর, চঞ্চল চাহনী, খাবার জন্য মিউ মিউ আওয়াজ আমরা দারুন উপভোগ করি। এখনো সে ঘরের বাইরে যেতে বেশ ভয় পায়, কারন বাইরের পরিবেশ তার জন্য একেবারেই অপরিচিত। তবে ইদানিং ধীরে ধীরে সে একটু আধটু বাইরে যাবার চেষ্টা করে, জানালার পাশে গিয়ে গভীর আগ্রহ নিয়ে চারিদিকের গাছ গাছালী, পাক পাখালী, পর্যবেক্ষণ করে। হঠাৎ বাইরের কোন বিড়াল দেখলে লেজ গুঠিয়ে পালিয়ে খাটের নীচে লুকিয়ে থাকে যতক্ষন পর্যন্ত না ভয় কাটে।কিছুদিন থেকে দেখছি ডোরার কাছে ছাই বাদমী মিশেল রঙের একটা অপরিচিত বিড়াল এসে ঘুর ঘুর করছে। আমরা ওই বিড়ালটির কাছে গেলে ও ভয়ে পালিয়ে যায়।  আমরা চলে এলে আবার ডোরার সাথে দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি করে খেলা করে। ডোরাও তার সাথে খেলতে পেরে বেশ খুশী। আমরা দূর থেকে এসব দেখি। সুন্দর লাগে তাই আনন্দ পায়। 

      এখন ডোরার অপরিচিত বন্ধু বিড়ালটা আগের থেকে অনেক সহজ হয়েছে। আগে আমাদের দেখলে পালিয়ে গেলেও এখন একটু যেন আস্থা পাচ্ছে। মনে হয় সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে আমরা তার কোন ক্ষতি করবনা। তাই মাঝে মাঝে কাছে আসে, আমরা হাত দিয়ে আদর করতে গেলে পালিয়ে যায়। বেশ কিছুদিনের মধ্যে দেখলাম সে আমাদের ডোরার আরো ঘনিষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের ডোরাকে নিয়ে বাইরে বেড়াতে বের হয়। ডোরাও তাকে পেয়ে একটু সাহসী হয়েছে। বেশ কিছুদিনের মধ্যে দেখলাম সে আর আমাদের মোঠেই ভয় পাচ্ছেনা। ডোরা যেরকম আমাদের সাথে স্বাভাবিক সেও এখন সেরকম। ডোরার সাথে আমাদের বিছানায় উঠে ঘুমাই। ডোরার মত আমাদের কাছে মিউ মিউ আবদার  করে খাবার চাই, এভাবে ডোরার সাথে তার বন্ধুত্বের মধ্যে দিয়ে এখন আমাদের ঘরের বিড়াল হয়ে গেছে। বাইরে গেলেও একটু এদিক ওদিক  ঘুরে আবার ফিরে আসে। এখন তার আমাদের উপর পূর্ণ আস্থা। আমি মাঝে মাঝে কোলে নিয়ে রসিকতা করে জানালা দিয়ে বের করে দিয়ে বলি তুই আমাদের বিড়াল না, তুই চলে যা। কিন্তু সে মূহূর্তেই অন্য জানলা দিয়ে আবার ফিরে এসে ডোরার সাথে বসে থাকে। এই বন্য বিড়ালটি থেকে এ শিক্ষাই পেলাল ভালবাসা আর আস্থা দিয়ে পৃথিবীতে সব কিছুকে বসে আনা যায়। আস্থা আর ভালবাসাই জগতের সব সুখ। একে অপরের প্রতি আস্থাবান হউন, তারপর ভালবাসা এমনিতেই তোমার জগতকে সুন্দর আর আনন্দময় করে তুলবে। এই বন্য বিড়াটি যেমন আমাদের  ভালবাসা আর আস্থা পেয়ে আমাদের কাছে পোষ মেনে গেছে।

-------------------------------------------------------------

No comments:

Post a Comment

একটি ছড়া

 পাগলা কাকা ( কবিতার পটভূমিঃ- এই ছড়া কবিতাটি মানসিক প্রতিবন্ধী  আমার এক দূর সম্পর্কীয় মরহুম কাকাকে নিয়ে, যিনি বেশ সম্পদশালী মানুষের সন্তান ছ...