পথ()
------জসীম উদ্দীন
পথ হাঁটতে গেলে পথের সাথে শুধুই পথই থাকেনা, পথের সাথে থাকে পথের আশে পাশের পারিপার্শিকতা। পথের পাশের গাছ-পালা, লতা-গুল্ম, পাক-পাখালী, এমনকি ছোট পিঁপড়েটা পর্যন্ত। পথকে পথে পথে সঙ্গ দেয় কত বিচিত্র জিনিষ। যেমন ধরুন পথ হাঁটতে হাঁটতে পথের ধারে দেখতে পেলেন নোংরা কাপড় পরা, দীর্ঘদিন দাড়ী গোঁফ না কাটা এক মানসিক প্রতিবন্ধী লোক, যাকে আমরা পাগল নামে ডাকি। সে বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় ও অকেজো জিনিষ পত্র কুড়িয়ে এনে এগুলা নিয়ে নিজের মধ্যে নিজে এক আলদা জগত সাজিয়ে নিয়েছে। এই ভাঙ্গা চোড়া অকেজো জিনিষ নিয়ে সে নিজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রেখে সেখানে এক অপার আনন্দ খোঁজে পেয়েছে। এই যে তার আনন্দ এই পাগলের হাসিতে আমি সুখ খুঁজে পায়।
পথ চলতে আমি এসকল বিচিত্র ধাঁচের বিচিত্র রকম জিনিষ দেখতে পায় বলে আমি পথে পথে অনন্দকেও খুঁজে পায়, তাই পথ চলতে বালবাসি। সে গ্রামের পথই হউক বা শহরের। গ্রামের পথে চলতে গেলে মনটা প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে মনের ভিতর এক অনাবিল আনন্দের সৃষ্টি করে। মন যখন সবুজে সবুজে সারী সারী গাছ দেখে তখন চাই সবুজের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে। আবার গাছে গাছে যখন পাখির কলরব শুনে, হরেক রঙের পাখির হরেক রকম কলতানে চঞ্চল মন নিজেকে স্তির রাখতে পারেনা। তখন মন চাই পাখির পাখায় নিজেকে আকাশের পানে উড়িয়ে দিতে। আবার পথের ধারে যখন মৃদু মৃদু ঢেউ তুলে কিশোরীর মত ছোট্ট নদীটি ধেয়ে চলে তখন মন বলে নদী হয়ে বন বাদাড়ের ভিতর দিয়ে অজানার পানে চলে যায়।
এ গেল গ্রামের পথ। আবার শহরের পথে চলতে চলতে যখন ফুটপাত ধরে হাঁটি সে আর এক বিচিত্র অনুভূতি।
সেই সিমেন্ট পলেস্তারার ফুটপাথ, অসংখ্য মানুষের চলাচল। ফুটপাতের হকার, তাদের হাঁক ডাক, ভিক্ষুক, তাদের ভিক্ষা করার নানা ফন্দী, ফুটপাতের পাশের দেয়াল লিখন, ফুটপাতে অবহেলায় অনাদরে বেড়ে উঠা পথ শিশু, আরো কত কিছু চোখে পড়ে। এসব জীবন ঘনিষ্ট অনুসঙ্গ আমার মানবিক অনভূতির তন্ত্রীকে তরঙ্গায়িত করে নানাভাবে।
পথ অনেক চলেছি, অনেক কিছু দেখেছি, কিছু আনন্দের, যা আজো মনে আনন্দের উৎস হয়ে আছে মনের গভীরে। আবার কিছু আছে অনেক করুন, অনেক ব্যথার যা আজো হৃদয়ে রক্ত ক্ষরন ঘটায়। মন এসব দৃশ্য দেখলে ব্যথায় কুঁকড়ে যায়।
এখন শরৎকালের শুরু, শীত এখনো আসেনি তবে চারিদিকে শীতের আমেজ। কুয়াসার স্বেত বস্ত্র পরিধান
করে ভোর তার ঘুমটা খুলে চোখ মেলে দেখছে তার রূপ ছড়ানো রূপালী জগৎ। এই ঋতু বৈচিত্রের কালে সব প্রয়োজন উপেক্ষা করে কয় দিনের জন্য স্বপ্নীল চোখের মাদকতা নিয়ে চলে গেলাম সেই বাল্যস্মৃতি সিক্ত মায়াময় গ্রামে।
আমাদের গ্রামটা বিরল এক ভৃপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট মন্ডিত গ্রাম। একদিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড় সাহসী বীরের মত। আবার বিপরীত দিকে আছে জন্মদাত্রিনী মায়ের মত বিশাল সাগর। তার বিস্তির্ণ জলরাশির শাড়ীর আঁচল এলাকা পাড়ের বিশাল জন গোষ্টীকে ঢেকে রেখেছে তার মমতার বন্ধনে।
এই দুয়ের মাঝখান দিয়ে সরিসৃপের মত এঁকে বেঁকে চলে গেছে শের শাহের মহান কীর্তি সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। এ সড়ক পথের বুক চিরে যুগে য়ুগে সভ্যতার আলো নিয়ে এসেছে কত শাসক, ধর্মীয় সংস্কারক, কত সাহসী বীর। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মুগ্ধতা নিয়ে গড়া আমাদের গ্রাম।
আজ অনেক দিন পর আবার গ্রামের পথে চলেছি। অল্পক্ষন হল বাস নামিয়ে দিল আমাদের গ্রামের বাজারে। বাজারে নেমে কয়জন বন্ধুর সাথে দেখা হল। কেউ বাজারে দোকানদারী করে, কেউ বাজার করতে এসেছে।
এখন একটা জিনিষ লক্ষ্য করলাম গ্রামে আর গ্রাম্যতা নাই, শহরের মেকীময়তা গ্রামকেও গ্রাস করছে ধীরে ধীরে।
বাজার অর্থনীতির প্রভাব গ্রামেও প্রভাব ফেলছে। কারো যেন ফুরসত নেই, সবাই ছুটছে টাকার পেছনে। সব জায়গায় একটা চাকচিক্যের ছাপ, আগের মত ঝুপড়ী দোকান ঘর নাই, বাজার সম্প্রসারনের জন্য বাজারের এক পাশে যে বিরাট বটগাছটা ছিল এখন তা আর নেই কেটে ফেলা হয়েছে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য, দুঃখ পেলাম বটগাছটাকে না দেখে। মনকে প্রবোধ দিলাম এভাবেই তো পৃথিবী থেকে চলে যেতে হবে মানুস, গাছ পালা পশু পাখি সবকিছুকে পুরাতন গিয়ে নতুনের বিজয় কেতন উড়বে।
যাই হউক এখন গ্রামের পথে রওনা দেব, বাজারের পাশ দিয়ে চলে গেছে আমাদের গ্রামের পথ। পরিচিত কয়জন রিকসাওয়ালা চাইল তারা বাড়ী পৌঁছে দিতে, আমি কারো রিকসা নিলাম না। কারণ রিকসাতে গেলে আমার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে। তাই হাতের ব্যগটা কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে চারিদিকে, পথের ধারে কুয়াশার চাদর শ্যমল সবুজ গাছ- পালার গায়ে ধূষর উর্ণী পড়িয়ে দিয়েছে। পাখিদের কলকাকলী শুনতে শুনতে হেঁটেই চলেছি। বেশ ভালই লাগছে। পথে সাথী হল বৃদ্ধ কৃষক রমিজ উদ্দিন।
তার সাথে যেঁছে কথা শুরু করলাম, চাচা আসসামু আলাইকুম, কেমন আছেন?
ভাল আছি, তোমাকে চিনলাম না যে বাবা,
তাকে বাবার পরিচয় দিলাম,
পরচয় পেয়ে বাবার প্রশংসা করে অনেক ফিরিস্তি গাইলেন।
তার কথা শেষ হলে তাকে বললাম
আপনি কোথায় গেছিলেন?
বাজারে গেছিলাম,
কেন গেছিলেন?
বাবা কিছু তরিতরকারি চাষ করেছি তা বিক্রি করতে ।
বিক্রি করেছেন?
করেছি,
দাম কেমন পেলেন?
ভাল,
কি কি চাষ করেছেন?
মিষ্টি কুমড়া, সীম, টমেটু,
কেমন ফলেছে?
বাবা এখন তো সব হাই ব্রীড, উচ্ছ ফলনশীল,
ফলন ভাল হয়, দামও মুঠামুটি আছে।
আপনার ছেলে মেয়ে কয়জন? তারা কি করে?
বড় ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকে, মেঝ ছেলে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, মেয়েটা একটা প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পড়ছে।
আমি খুশী হলাম কৃষক পরিবারের সন্তানরাও আজ ভাল লেখা পড়া করে প্রতিষ্টিত হচ্ছে বলে।
চাচী আছেন?
আছে বাবা, তবে অসুস্থ, ডাইবেটিস, ব্লাড প্রেসার বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায়ই শয্যাসায়ী।
তুমি কি কর বাবা?
আমি একটি ব্যঙ্কে চাকরি করি,
তোমরা ভাই বোন কয়জন?
আমরা ভাই বোন তিন জন,
অন্যেরা কি করে?
বড় ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন,
আমার ছোট বোনও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।
আবার বাবার প্রসঙ্গ টেনে চাচা বলতে লাগলেন,
আহা তোমার বাবা অনেক ভাল মানুষ ছিলেন, প্রথম এই এলাকার বি এ পাশ করা লোক। তোমার বাবা বি এ পাশ করলে আমরা তাকে দেখতে গেছিলাম। তখন বিএ পাশ ফেলে রাখ, এন্ট্রেস পাশ অর্থাৎ মেট্রক পাশ করলে মানুষ দেখতে যেত। তোমার মা ভাল আছে?
জী-, তবে তিনিও চাচীর মত প্রসারের রোগী।
কথা বলতে বলতে চাচা তার বাড়ীর কাছে এসে পৌঁছল, তাই তাকে বিদায় দিতে হলো, সালাম জানিয়ে তাকে বিদায় দিলাম।
এখন আবার একা একা হাঁটতে শুরু করলাম, পথ হাঁটলে আমি পথের আশে পাশে দেখি, এমন কিছু চোখে লাগে কিনা। যা আমার লেখার খোরাক হতে পারে, বেশীক্ষন একা একা হাঁটতে হল না, লক্ষ্য করলাম একটা মধ্য বয়সী লোক চেহেরায় কিছুটা প্রতিবন্ধি ছাপ গরু চড়িয়ে গুধূলী লগ্নে বাড়ী ফিরছে। তিন চারটা গরু ও তাদের বাচুর। এসব সামলিয়ে পথ চলতে তার বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। একটাকে সামলাতে গেলে আর একটা রাস্তার পাশে ধান ক্ষেতে নেমে পড়ে মানুষের ধান খেয়ে ফেলে, নিসিন্দা গাছের ডাল দিয়ে মেরে আবার তাদের পথে আসতে বাধ্য করা হচ্ছে। মা' গরুকে নিয়ন্ত্রন করলে বাচ্ছা দুষ্টুমী করে, আবার বচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করলে মা গরু দুষ্টুমী করে। এরূপ ব্যস্ততার মাঝেও তার সাথে কথা জুড়ে দিলাম, মনে করেছিলাম বিরক্ত বোধ করবে, কিন্তু না, সেও যথাসাধ্য চেষ্টা করে আমার সাথে সঙ্গ দিতে।
চাচা কেমন আছেন?
কেমন থাকব বাবা, দেখছনা, কি রকম আছি।
গরু কি আপনার?
না বাবা, আমি এক গেরস্ত বাড়ীতে অনেক বৎসর ধরে কামলা থাকি। তাদের ঘর গেরস্তি চাষবাদ এগুলা দেখাশুনা করি, মাসে খাওয়া দাওয়া পোষাক আশাক সহ বর্তমানে তিন হাজার টাকা বেতন দেয়।
তো আপনার ছেলে মেয়ে কয়জন?
আমি ত বাবা বিয়ে করিনি,
এত বয়স হয়ে গেল বিয়ে করেন নি কেন?
বাবা আমরা গরীব মানুষ, সে অনেক কথা, গরীবের দুখের কাহিনী শুনে তোমাদের লাভ কি।
বললাম আসুবিধা নাই চাচা আপনি বলুন।
তার দুখের কথা শুনার আগ্রহ দেখে সে স্বতঃস্ফুর্তভাবে তার জীবনের কিছু ঘটনার অবতারনা করতে লাগল ।
বলতে লাগল, আমার বয়স যখন সাত তখন আমার মা মারা যায়। মা মারা যাবার পর কিছুদিনের মধ্যে বাবাকে আত্মীয় স্বজন মিলে আবার একটা বিয়ে করিয়ে দেয়। বাবার বিয়ের পর শুরু হল সংসারে অশান্তি, নতুন মা আমাকে কিছুতেই সহ্য করতে পরছিলনা, বাবা নতুন মাকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়েওৌ আমার উপর বৈরী মনোভাব রোধ করতে পারলনা, পরে বাবা আর উপায়আন্তর না দেখে আমাকে পাশের এক গেরস্ত বাড়ীতে চাকুরীতে দিয়ে দেয়। এইখানে আসার পর মা বাবার স্নেহ বঞ্চিত হয়ে আমি ধীরে ধীরে অন্য রকম হয়ে গেলাম, আমার বুদ্ধি আগের ছেয়ে অনেকটা লোপ পেয়ে গেল, আমি অন্য রকম এক মানুষে পরিনত হয়ে গেলাম। এভাবে এই বাড়ীতে দীর্ঘ চল্লিস বছর কাজ করতে করতে অনেকটা ওদের ফ্যামিলি মেম্বারের মত হয়ে গেলাম। কিন্তু তারা আমাকে তাদের ফ্যামেলির একজন মনে করলেও আমার লেখা পড়া, আমার ভবিষ্যত এসব নিয়ে চিন্তা করেনি, আমি একজন সংসাারী মানুষ হিসাবে আমার বিয়ে শাদী এসব ব্যপার নিয়ে মাথা ঘামায়নি। তাদের ধারনা আমি আমার সংসার জীবন চালনা করতে পারবনা, বউ বাচ্ছার খরছ পাতি মেটাতে পারবনা, তাই এভাবে আমার জীবনটা বাউন্ডেলেভাবে কেটে যায়। তবে আমার সাংসার জীবন না হলেও আমি আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের এতিম ছেলেকে এতিম খানায় রেখে পালন করছি, তার লেখা পড়ার যাবতীয় খরছ আমি বহন করি। আমার কোন সন্তান না থাকলেও এছেলেটাকে আমি আমার সন্তান মনে করি। মাঝে মাঝে তার জন্য ভাল মন্দ খাবার কিনে নিয়ে যায়। কাপড় চোপড় কিনে দিই। তার বিভিন্ন সখ মেটাতে চেষ্টা করি। আমার জীবনের যত স্বাধ আল্লাদ তার মাধ্যমে পুরন করার চেষ্টা করি। চাচা মাঝে মাঝে গরু গুলাকে সামলিয়ে, আবার আমার কথায় মনোযোগী হয়, আবার কোন কোন সময় কথার খেয় হারিয়ে ফেললে আমি খেয় ধরিয়ে দিই। এইভাবে চলতে চলতে তার জীবনের অলিখিত পুন্ডুলিপি আমার হৃদয়ে লিখে দিতে দিতে এক সময় এসে পৌছলাম আমাদের বাড়ীর কাছে। একটি করুন জীবনের এক ব্যথিত অভিনেতার জীবন যুদ্ধের গল্প শুনতে শুনতে তাকে ব্যথা ভরা হৃদয়ে বিদায় জানাতে হল, আমি আমার বাড়ী দিকে রওনা দিলাম, সে অন্যপথে তার গন্তব্যে গরুর পাল নিয়ে পথের সাথে মিশে গেল। আর আমাকে দিয়ে গেল জীবন যুদ্ধের একরাশ তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রছন্ড ঝাঁকুনী।
-------------